সংসদ ও প্রযুক্তি প্রতিবেদক | বাংলাদেশ প্রতিদিন
প্রকাশিত: ১০ জুন, ২০২৬
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ সাইবার স্পেসে গুজব, মানহানিকর ও ভুয়া কনটেন্টের বিস্তার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ব্যবহার করে বিভ্রান্তিকর ও আপত্তিকর ভিডিও, অডিও ও ছবি তৈরি প্রতিরোধে ‘সাইবার সুরক্ষা আইন’ সংশোধনের বড় উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। নতুন সংশোধনীতে ফেসবুকের মূল প্রতিষ্ঠান মেটাসহ আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোকে ক্ষতিকর কনটেন্ট অপসারণে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে ব্যবস্থা নিতে বাধ্য করার আইনি বিধান যুক্ত করা হচ্ছে।
গত সোমবার (৮ জুন) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে সরকারদলীয় (বিএনপি) সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য হেলেন জেরিন খানের একটি সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানান।
সংসদে হেলেন জেরিন খান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া আইডি, বট নেটওয়ার্ক, এআই (AI) দিয়ে তৈরি ভুয়া কনটেন্ট, নারী ও শিশুদের অনলাইনে হয়রানি এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সুপরিকল্পিত অপপ্রচারের বিষয়টি তুলে ধরেন।
এর জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “কিছুদিন ধরে আমরা লক্ষ্য করছি, বাংলাদেশের সরকারপ্রধান (প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান), তাঁর স্ত্রী, তাঁর কন্যা, আমার স্ত্রী-কন্যা এবং সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বা প্রতিপক্ষ বিবেচনায় নোংরা কনটেন্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো হচ্ছে। স্বাধীনতার নামে এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার নামে ভার্চুয়াল মিডিয়ায় যা খুশি তা-ই করা হচ্ছে। এটা আসলেই মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কি না, তা এখন পুনরায় সংজ্ঞায়িত করা দরকার।”
মন্ত্রী জানান, বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইনভিত্তিক সব প্ল্যাটফর্মকে অন্তর্ভুক্ত করে ‘সাইবার স্পেস’-এর নতুন সংজ্ঞা নির্ধারণের কাজ চলছে এবং এ লক্ষ্যে সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধনের খসড়া বা ড্রাফট প্রণয়নের কাজ শুরু হয়েছে। সংশোধিত আইনে গুজব, অপতথ্য, মানহানি এবং বিভ্রান্তিকর কনটেন্টের সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা ও কঠোর শাস্তির বিধান সংযোজন করা হবে।
সংসদে প্রশ্ন তোলা হয় যে, মেটাসহ আন্তর্জাতিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ক্ষতিকর কনটেন্ট অপসারণে সরকার কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেবে কি না। জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন, “বাংলাদেশের বিদ্যমান আইনে এখনো এমন কোনো শক্ত বিধান নেই, যার মাধ্যমে মেটাকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কনটেন্ট সরাতে বাধ্য করা যায়। বিটিআরসি অনুরোধ পাঠালেও তারা অনেক সময় বলে যে ‘তোমাদের তো আইনি কভার ঠিকমতো নাই’। সুতরাং আইনি ভিত্তি না থাকলে আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মগুলোকে চাপ দেওয়া যায় না।”
তিনি জানান, নতুন সংশোধনীতে আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোর সঙ্গে সমন্বয়, নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে বাধ্যতামূলক কনটেন্ট অপসারণ এবং রিপোর্ট করা কনটেন্ট সরানোর প্রক্রিয়াকে আইনি কাঠামোর মধ্যে এনে জবাবদিহিমূলক করা হবে।
উল্লেখ্য, শেখ হাসিনা সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকার পূর্ববর্তী বিতর্কিত ‘সাইবার নিরাপত্তা আইন-২০২৩’ রহিত করে একটি নতুন অধ্যাদেশ জারি করেছিল। পরবর্তীতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে তা ‘সাইবার সুরক্ষা আইন’ নামে পাস হয়।
তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, বর্তমান আইনে ভুয়া তথ্য বা মানহানিকর কনটেন্ট ছড়ালে অপরাধীদের বিরুদ্ধে কার্যকর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার পর্যাপ্ত ধারা নেই। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের সাইবার সিকিউরিটি বিভাগের যুগ্ম পুলিশ কমিশনার সৈয়দ হারুন অর রশীদ জানান, বর্তমানে কোনো অভিযোগ আসলে তারা কেবল বিটিআরসিকে লেখেন এবং বিটিআরসি তা সাময়িকভাবে ডাউন করে। মেটার সঙ্গে কোনো আইনি চুক্তি বা দেশীয় শক্ত আইনি বাধ্যবাধকতা না থাকায় ফেসবুক বা ইউটিউব থেকে এই কনটেন্টগুলো স্থায়ীভাবে সরানো যায় না।
সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষক তানভীর হাসান জোহা জানান, চাইল্ড পর্নোগ্রাফি বা জঙ্গিবাদের মতো বিষয়ে মেটা দ্রুত সাড়া দিলেও রাজনৈতিক বা মানহানিকর কনটেন্ট সরাতে তারা সাধারণত গুরুত্ব দেয় না।
আইন সংশোধনের এই উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করলেও এর রাজনৈতিক অপব্যবহার নিয়ে গভীর আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মেটা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বিভিন্ন দেশের ‘এমল্যাট’ (MLAT - Mutual Legal Assistance Treaty) বা পারস্পরিক আইনি সহায়তা চুক্তি থাকে। বাংলাদেশ সরকার আইন সংশোধন করে মেটার সঙ্গে চুক্তি করলেও রাজনৈতিক কনটেন্ট সরানোর ব্যাপারে মেটা তাদের নিজস্ব বৈশ্বিক নীতিমালার বাইরে যাবে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক বিএম মইনুল হোসেন বলেন, “আমাদের দেশে অনেক সময় দেখা যায়, বিরোধী দল বা ভিন্ন মতকে দমানোর জন্য এই ধরনের আইনের আড়ালে ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করা হয়, যা নাগরিকের গোপনীয়তার অধিকার লঙ্ঘন করে। তাই এই আইনের রাজনৈতিক ব্যবহার বন্ধের শতভাগ নিশ্চয়তা থাকতে হবে এবং সামাজিক মাধ্যমগুলোকেও ব্যবহারকারীর সুরক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।”
প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |